#বেলা_শেষে #শাওন_সিকদার #পর্ব-৩
#বেলা_শেষে
#শাওন_সিকদার
#পর্ব-৩
জীবনে এর থেকে বড় শক বোধয় ইমতিয়াজ সাহেব কখনো খায় নি।দুই চোখ বড় বড় করে চশমার ফাক দিয়ে সিমিকে দেখছেন তিনি।ব্যাপারটা প্যারাডক্সের মতো লাগছে।সবই তার চোখের সামনে হচ্ছে।এমন না যে তিনি সপ্ন দেখছেন।তাহলে তিনি কেন বুঝতে পারছেন না কি হচ্ছে এখানে।এটা তো সেই সিমি যে শত অপরাধ করলে যে কাউকে হাসি মুখে ক্ষমা করে দেয়।নম্রতা ভদ্রতার কারণে পুরো ভার্সিটি জুড়ে বিশেষ সুনাম যার।যে কখনো এই ইমতিয়াজ কে তুমি ছাড়া অন্য কিছু বলে সম্বোধন করে নি,আজ সামান্য একটা ওয়েটারকে চর মারায় সে তুই বলে সম্বোধন করছে।তাও প্রচন্ড কঠোর ভাষায়।অবাকের সপ্তম আকাশে ইমতিয়াজ সাহেব।দ্বীতিয় বারের মতো চশমাটা ঠিক করে নিলো সে।ইমতিয়াজ সাহেবের এই অবাক হওয়া সিমিকে বিন্দুমাত্র ভাবান্তর করলো না।আগের মতো কঠোর ভাষায় আবার জিজ্ঞেস করলো,
----আমি তোকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি।হাবার মত তাকিয়ে থাকতে বলিনি..?
ইমতিয়াজ সাহেব নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
----সিমি কি হয়েছে তোমার? তুই তোকারি করছো কেন?সামান্য একজন ওয়েটার কেই তো বলেছি।
তাছাড়া এদের মতো ছোটলোককে আর কি বলা যায় বলো?দেখতেই পাচ্ছো টাকা টাকা করে কেমন পাগল করে দিচ্ছে ছোটলোকের মতো।
----ঠাসসসসসস
কোন রকম পূর্বসতর্কতা ছাড়াই হুট করে প্রচন্ড কষে একটা চড় পরে গেলো ইমতিয়াজ সাহেবের গালে।রক্তলাল চোখে এখনো ক্ষ্যাপা বাঘীনির মতো ফুসছে সিমি।২য় বারের মতো ছোটলোক শব্দটা সিমির কানে পৌছাতে দেরি কিন্ত চর মারতে এক সেকেন্ডও দেরি করে নাই।একজন সিনিয়র শিক্ষক কে চর মারার পরও তার বিন্দু মাত্র আক্ষেপ নেই।বরং তার হাতদুটো আবার মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আসছে।হয়তো আবারো চর মারতে ইচ্ছে করছে তার।কিন্ত নিজেকে সামলে নিলো সে।কন্ঠটা আগের মতোই কঠোর করে একটা আঙুল উচু করে বললো,
----ও কোন ছোটলোক নয়।স্বামী হয় আমার।তোর কোন অধিকার নেই আমার স্বামীকে ছোটলোক বলার।পরের বার আমার স্বামীর গায়ে হাত দেওয়ার আগে শত বার ভেবে দেখবি।
শাওনের দিকে তাকালো সিমি।এখনো গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।ছল ছল চোখে তাকিয়ে আছে সিমির দিকে।শাওনের চাহনি দেখে সিমির বুক মোচর দিয়ে উঠলো।প্রিয় মানুষটার এমন করুণ চাহনী সত্যিই সহ্য করার মতো না।যদিও একজন ওয়েটারের জন্য ব্যাপারটা তেমন গুরুতর না।কিন্ত সেটা সিমিকে বুঝাবে কে??এই চাহনিটা একেবারে বুকে গিয়ে বিধছে তার!সিমির প্রচন্ড ইচ্ছে করছে এই মুহূর্তে ইমতিয়াজ সাহেবের হাড়গোড় সব মেরে ভেঙে ফেলতে।যদি সুযোগ থাকতো তাহলে এই সুযোগ সে কখনো মিস করতো না।নিত্যান্তই বাধ্য হওয়ায় আর কিছু বললো না।সে আস্তে আস্তে শাওনের দিকে আসলো।দুই হাত দিয়ে শাওনের গালদুটো আলতো ভাবে স্পর্শ করলো।গালের বা পাশ টা লাল হয়ে গেছে।দুই চোখ এতক্ষন ছল ছল করছিলো।সিমির স্পর্শ পেয়ে ছল ছল চোখের পানির বাধ ভেঙে গেলো।দুই চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।চোখের পানি মাটিতে পড়লো না আর।তার আগেই দুই হাত দিয়ে সযত্নে চোখের পানি মুছে দিলো সিমি।তার চোখও ছলছল করছে।শাওনের এই চাহনীটা সে সত্যিই নিতে পারছে না।আসীম মায়া ভর করে আছে এই চাহনীতে।দৃষ্টি ফেরানো দায়।সিমি চেয়ে আছে শাওনের দিকে আর শাওন সিমির দিকে।দুই জোড়া চোখ আবারো একে অপরের নেশায় মত্ত।কতশত অভিযোগ,ভালোবাসা,ভাব আদান প্রদান হচ্ছে এই চাহনির মাঝে।বাহিরের দুনিয়ার বোঝার সাধ্য নেই এই চোখের ভাষা।ভাষাটা নিত্যান্তই তাদের দুজনে।
অল্পশোকে কাতর,অধিক শোকে পাথর বলে একটা কথা আছে।ইমতিয়াজ সাহেবের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অনেকটা তেমন।এতক্ষন অল্প অবাক ছিলেন তিনি।কিছু কিছু কথা বলছিলেন।কিন্ত এই মাত্র যা হলো তার ফলে সে অবাকের সপ্তম আকাশ থেকে আছড়ে পরলো।একেবারে নির্বাক হয়ে গেলো।একজন সিনিয়র শিক্ষক হয়ে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত নবীন কেউ একজন তাকে পাব্লিক প্লেসে চড় মারলো।ব্যাপারটা এখনো মেনে নিতে পারছেন না তিনি।এটা কি সত্যিই হয়েছে?নাকি কোন স্বপ্ন দেখছেন তিনি?গালে হাত দিলেন তিনি।গালটা প্রচন্ড গরম হয়ে আছে।ঠোটের কোনাটা জালা করছে।হয়তো কেটে গেছে।ইমতিয়াজ সাহেবের সাথে কি যে হচ্ছে ব্যাপারটা এখনো তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না।আরেকটা ব্যাপার হলো এই হোটেলের সামান্য ওয়েটার টা নাকি সিমির হাজবেন্ড।সিমি কি কোন জোক করলো?ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের স্বামী হলো ওয়েটার!!!এটা জোক ছাড়া আর কি হয়ে পারে।সিমির দিকে তাকালো সে।এখনো ওয়েটারের গালে হাত দিয়ে ওয়েটারের দিকে তাকিয়ে আছে সিমি।তাকিয়ে আছে তো আছে একেবারে মরার মতো তাকিয়ে আছে।দুনিয়ায় যে আরো মানুষ আছে সে সম্পর্কে কোন হুস নেই একেবারে।কতটা ভালোবাসা থাকলে একজন আরেকজনের নেশায় এভাবে মত্ত হতে পারে।ঠাস করে বসে পড়লো পাশে থাকা চেয়ারটায়।মাথায় হাত দিয়ে জাস্ট নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।পরিস্থিতি এখনো তার বুঝার বাইরে।
ইমতিয়াজ সাহেবের নড়াচরায় আবার ঘোর ভেঙে গেলো দুজনের।কিন্ত আগের মতো লজ্জায় পরলো না বরং সাভাবিক ভাবেই নিলো ব্যাপারটা মনে হয়।সিমি আলতো করে শাওনের গালে হাত বুলিয়ে দিলো।তারপর দুই হাত দিয়ে নিজের চোখের কোনে জমে থাকা পানি টুকু মুছে নিলো।হন হন করে চলে যেতে নিলো সে কিন্ত।কিন্ত অল্প একটু গিয়ে আবার দাঁড়িয়ে গেলো।ইমতিয়াজ সাহেব মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।সিমির দিকে তাকালো সে,সিমিও তাকালো ইমতিয়াজ সাহেবের দিকে,চোখ দুটো আগের মতো রক্তলাল করে এক হাতের আঙুল উচিয়ে ইমতিয়াজ সাহেবকে বললো,
----যা বলেছি মনে থাকে যেন!
বলেই হন হন করে বেরিয়ে গেলো রেস্টুরেন্ট থেকে।ইমতিয়াজ সাহেবের ভাবান্তর নেই।অবাক হতে হতে সে এখন নিশ্চুপ হয়ে গেছে। জাস্ট চুপ করে তাকিয়ে আছে।কিছু বলছে না।
এতক্ষন ইমতিয়াজ সাহেব আর সিমির মধ্যে যা যা হয়েছে শাওন খালি নীরব দর্শকের মতো দেখেই গেছে।কোন অংশগ্রহণ করেনি।কিন্ত এখন সে প্রচুর খুশি।সিমিকে অন্য কারো সাথে দেখে সে ভেবেই নিয়েছিলো সিমি তাকে ভুলে গেছে।কিন্ত এখন যা দেখলো তাতে তার ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে।সিমি এখনো তাকে ভালোবাসে।শুধু ভালোবাসে না,প্রচন্ড প্রচন্ড ভালোবাসে।এতটা ভালোবাসে যে সে এতদিন পরও ঠিক আগের মতো অনুভব করতে পারছে।সেই ভালোবাসার তেজ ইমতিয়াজ সাহেবের মতো মানুষকে চুপ করিয়ে রেখেছে।জীবনে এতকিছু ঘটার পর শাওন কখনো ভাবেনি যে এতটা ভালোবাসা তার কপালে আছে।আজ শাওন খুশি।প্রচন্ড খুশি।ইমতিয়াজ সাহেবের উপর কোন ক্ষোভ নেই তার।বরং ইমতিয়াজ সাহেব কে জড়িয়ে ধরে চুমু খাইতে ইচ্ছে করছে।পরিস্থিতি অনুকূল থাকলে হয়তো চুমুটা দিয়েই ফেলতো।
#চলবে

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন