গল্পঃমজিদের তিন নাম্বার বউ লেখকঃঃশাওন সিকদার
গল্পঃমজিদের তিন নাম্বার বউ
লেখকঃঃশাওন সিকদার
লালসালু উপন্যাসের ষাটোর্ধ ভন্ড মজিদের মাথায় আবারো বিয়ের ভূত চাপলো।এবার তার চোখ হাসুনির সই সাহেরার দিকে।সাহেরার বাবা মা গ্রামে থাকলেও সাহেরা এতদিন শহরে দুঃসম্পর্কের এক মামার বাসায় থাকতো।মাসখানেক আগে গ্রামে এসেছে।শহরের বাতাস লেগে সাহেরা এখন আলি-ঝালি চওড়া বেওয়া হয়ে উঠেছে।পুরো গ্রাম নিজে একাই মাতিয়ে রাখে।তার হাসি আর নাচন দেখে পাগল হয় গ্রামের শত শত লোক।গ্রামের অন্যসব মেয়েদের মত সেকেলে নয় সে।এখন সাহেরার তাপে পুরো গ্রাম কাপে।যেমন টা কেপেছে মজিদ।কয়েকদিন আগেও মজিদ কিছু জানতো না সাহেরার ব্যপারে।ব্যাপারটা প্রথম মজিদের নজরে আনে গ্রামের নীলু ঘটক।
বাবা মা আদর করে নাম রেখেছিলো নীলয়।গ্রামের মানুষ নামটার খতনা করে নীলু বানিয়ে দিয়েছে।গ্রামের মানুষদের বিশেষ প্রতিভা এইটা।আপনার যতই সুন্দর নাম হোক তারা এইটার একটা লাইট ভার্সন বের করবেই।যেমন নীলু ঘটক সাহেরাকে ডাকে সারু বুজান বলে।নীলু ঘটকের অনেকদিনের ইচ্ছে মজিদের কাছের লোক হবে।কিন্ত বিশেষ কোন সুযোগ পেয়ে উঠছিলো না সে।পাবেই বা কি করে?খালেক ব্যাপারীর মত মানুষ যেখানে মজিদের উচু গলায় কথা বলে না সেখানে নীলু ঘটক তো চুনোপুটি।কিন্ত বেশ কয়েকদিন ধরে নীলু গ্রামে একটা মেয়ের নাচানাচি একটু বেশিই লক্ষ্য করে।তারপরই তার মাথায় চলে আসে সুবর্ণ সুযোগ মজিদের ঘনিষ্ঠ হওয়ার।মেয়েটাকে দেখে তার মনে হাহাকার হয়নি সেটা হলা যাবে না।কিন্ত মজিদের কাছের লোক হতে হলে এতটুকু ত্যাগ তার করতেই হবে।
এইতো সেদিন সাহেরা আর হাসুনী নদীর পারে বসে গল্প করতেছিলো,হাসুনি বলে,,,,
---বুঝলি সারু,শহতে তো অনেক সোন্দর সোন্দর পোলা মানুষ আছে।একেকটা রাজপুত্তুর।তাগো অউকগার ধারে যদি বিয়া বইতে পারতাম বইন।এই গ্রামে তো সব গুলান কালা কালা।আমাগো কপালে এই কালাই আছেরে মনে হয়।
---সাহেরা কিছু বলে না শুধু মুচকি হাসে।কারণ শহরে সে সত্যি সত্যি এক রাজপুত্তুর রেখে এসেছে।তার কথা মনে পড়তেই সাহেরা লজ্জায় টমেটোর মত লাল হয়ে গেল।
সাহেরার হাসি দেখে হাসুনি একটু অবাক ই হলো।হাসুনি আবার বললো,
---হাসিস কেন?
সাহেরা আবার মুচকি হেসে জবাব দিলো,,,
---আমার লইজ্ঞা সত্যিই এক রাজপুত্তুর আছেরে হাসুনি।শহরে রাইখা আসছি।কয়দিন পর আমগো বাড়িত সম্বন্ধ নিয়া আইবো।তোর মত আমার কপালে কালা নাইরে।আমার কপালে আছে শহরের রাজপুত্তুর।
সাহেরার চোখেমুখে তৃপ্তির হাসি।খানিকটা খুশি,খানিকটা অহংকার।সাহেরা উঠে দাড়ালো।দুই হাত মেলে ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে বড় একটা নিঃশ্বাস নিলো।বাম চোখটা একটু ট্যারা করে হাসুনির দিকে তাকালো।হাসুনিকে জলতে দেখে ভালোই লাগছে তার।হাসুনির জলছে।প্রচুর জলছে।সাহেরা কেন শহরের রাজপুত্তুর পাবে।সেও তো হাসুনির মত এই গ্রামেরই মেয়ে।হাসুনির ইচ্ছে করছে সাহেরার চুল ধরে উদোম কেলানি দিয়ে ওর মুচকি হাসি মাখা মুখটা লাল করে দিতে।আপাতত ইচ্ছেটাকে একপাশে রেখে সাহেরাকে পটাতে ব্যাস্ত হলো হাসুনি।যদি সাহেরার মাধ্যমে একটা শহুরে রাজ পুত্তুর পাওয়া যায়।
দূরে দাঁড়িয়ে সাহেরা আর হাসুনির এই কথোপকথন ঠিকই লক্ষ্য করেছিলো নীলু ঘটক।তার মুখে শয়তানি হাসি।এবার বুঝি মজিদের কাছের মানুষ হতে পারবে সে।হাসতে হাসতে বাড়িতে চলে গেলো সে।
দুইদিন পরের কথা।আজকে সাহেরা আর মজিদের বিয়ে।নীলু ঘটক আজ খুব ব্যাস্ত।ভাবতেই তার ঈদের মত লাগছে।অনেক কষ্টে মজিদের কাছের মানুষ হতে পেরেছে সে।অবশেষে তারও একটু ক্ষমতা হবে মহব্বতপুরে।সে খুব দৌড়াদৌড়ি করছে।জানালা দিয়ে সাহেরা নীলু ঘটককে দেখছে আর ফুসছে।বেটা নীলু ঘটককে একলা পেলে বুঝিয়ে দিতো কত ধানে কত চাল।নিজের ভালোবাসার মানুষকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করতে হবে।তাও ৬০ বছরের একটা বুইড়া কে।সাহেরার প্রচুর কান্না পাচ্ছে।সে অবশ্য অনেক চেস্টা করেছিলো বিয়েটা যাতে না হয়।বাবা মা কে অনেক বুঝানো শেষ।কিন্ত তাদের একটাই কথা।পীরের সাথে বিয়ে হলে তাদের বেহেস্ত নিশ্চিত।বেহেস্ত যাওয়ার এই সুযোগ তারা হারাতে চায় না।সাহেরা শেষ বারের মত একটা চিঠি লিখলো তার রাজপুত্তুর এর কাছে।তারপর বিয়ের পিড়িতে বসলো।
এখন সন্ধ্যা।বিকেল বেলাই সাহেরা আর মজিদের বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিলো।অবশ্য রহিমা আর জমিলা প্রচুর সাহায্য করেছে তাদের সতিনের বিয়েতে।বিয়ের প্রথম দিকে জমিলা একটু ঘারত্যারা ছিলো।যদিও মজিদ সব সামলে নিয়েছে।এখন সাহেরার বিদায়বেলা।সাহেরা পালকিতে উঠে বসেছে।হঠাৎ দূর থেকে কারো চিতকার শুনা যাচ্ছে।সাহেরা বাইরে তাকালো।হাসুনি দৌড়ে দৌড়ে আসছে সাহেরাকে বিদায় দেওয়াত জন্য।সাহেরার অবস্থা এখন একেবারে করুন।ছেড়ে দে মা কেদে বাঁচি অবস্থা।কালকেই হাসুনির সাথে কত ভাব নিয়ে কত কথা বলেছিলো।আজ সে বুইড়া মজিদের বউ।ভাবতেই লজ্জায় মাথা কাটা যাচ্ছে সাহেরার।হাসুনি দৌড়ে এসে বললো,
---কিরে সারু,তাইলে শশুড় বাড়ি চইলাই যাইতাছোস?
হাসুনি মুচকি মুচকি হাসছে।হাসুনির হাসিটা সাহেরার তীরের মত বিধছে।সাহেরা রাগে অবস্থা খারাপ।না পারছে কিছু করতে না পারছে সইতে।বজ্জাত টা অবস্থা বুঝে এখন মজা নিচ্ছে।সাহেরার রাগে গাল দুটো টুকটুকে লাল হয়ে গেলো।হাসুনি আবার বললো,
---তোরে অনেক মিস করুম রে সারু।সময় পাইলে বাড়িত আইস।
সাহেরা দাতে দাত চেপে বিরবির করে বললো মিস করবি না ছাই।বজ্জাত একটা।প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে সাহেরার।কিন্ত দাতে দাত চেপে আটকে রেখেছে। পালকি চলতে শুরু করলো।সাহেরার গন্তব্য ষাটোর্ধ মজিদের বাড়ি।আজ থেকে সেও গ্রামের সম্মানিত মানুষ।সবাই তাকে সম্মান করবে রহিমা আর জমিলার মত কারণ সে ষাটোর্ধ মজিদের তিন নাম্বার স্ত্রী।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন